সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের আবাসন ও নগরায়ণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শুধু একটি ঘর বা মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য নয়, বরং নাগরিকদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, টেকসই আবাসনের ধারণা কোনো নির্দিষ্ট ভবন বা বাসস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত পয়োনিষ্কাশন, সুশৃঙ্খল গণপরিবহন, ভালো সড়কব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ—সবকিছুর সমন্বয়েই একটি বাসযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে। এই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। দেশের শহর, বন্দর ও নগরকেন্দ্রগুলোতে জনসংখ্যার চাপ ক্রমাগত বাড়ছে, যা পরিকল্পিত নগরায়ণের পথে একটি বড় বাধা। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় নাগরিকদের জন্য শুধু আবাসন নয়, বরং টেকসই জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সবার জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং মৌলিক নাগরিক সেবাসম্পন্ন আবাসন যে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মানুষের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সেবা ও নাগরিক সুবিধাগুলোও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজধানী ঢাকা বর্তমানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের মুখে রয়েছে।
পরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১১ নম্বর লক্ষ্য অনুসরণে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও সহনশীল নগর গড়ে তোলার ওপর তিনি জোর দেন। রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার বাড়তি চাপ কমাতে বড় শহরগুলোর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত ও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। তিনি জানান, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ বা উপ-শহর গড়ে তোলার কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের অন্যান্য বড় শহরেও প্রায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আবাসন প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই নতুন আবাসিক এলাকা ও নগরকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, দেশের আবাসন সংকট কেবল সরকারি উদ্যোগে সমাধান করা কঠিন, তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের গৃহীত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নে ভারসাম্য ফিরে আসবে। উল্লেখ্য, বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই মেলায় আবাসন ও নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ী, ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, রাজউক, স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মোট ১৫৭টি স্টল অংশগ্রহণ করেছে। তবে পরিকল্পনার কথা বলা যতটা সহজ, বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন বলে স্বীকার করেন তিনি।
Leave a Reply