১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ২০০৯ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সুনাম ও লাভের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। তবে জাতীয় পার্টির নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। তার শাসনামলে সংঘটিত বিশাল আর্থিক অনিয়ম ব্যাংকটির ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়। ‘বাচ্চু আমলের’ ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে বেসিক ব্যাংক। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিতে বাড়তি খরচ, সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি বস্তিবাসী। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা এখন সুলিভান। বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক মারা গেছেন। একসময় বেসিক ব্যাংক ছিল স্বনামধন্য ও লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১২ সালের নভেম্বরের মধ্যে ব্যাংকটির চারটি শাখায় চরম অনিয়মের মাধ্যমে ৪ হাজার ৪২৪ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এই জালিয়াতি উদ্ঘাটনের পর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করা হয় এবং ২০১৪ সালের জুলাইয়ে বাচ্চু পদত্যাগ করেন। ততদিনে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০১০ সালের ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ১৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। গভীর রাতে ৪.৮ মাত্রার ভূমিকম্প, উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারে। ওই সময়ে এই ব্যাংকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের ঘটনা ঘটে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে দায়ী করার আগেই তিনি দেশ ত্যাগ করেন। অনিয়মের জেরে ২০১৩ সালে ব্যাংকটি ৫৩ কোটি টাকার লোকসানে পড়ে, যা ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৩ সালে ৪১৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৫৫ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৬৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সঙ্গে ব্যাংকটিতে ৫ হাজার ৫১ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
গত এপ্রিলে ব্যাংকটিকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা তারল্য সংকটকে আরও প্রকট করে তোলে। বর্তমান চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। ব্যাংকটি সরকারি তহবিল বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা চেয়েছে, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই তহবিল পেলে ব্যাংকটি উচ্চ সুদের আমানত সমন্বয় করতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যাংকের বর্তমান লক্ষ্য হলো খেলাপি ঋণ আদায়, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন রপ্তানিকারক যুক্ত করা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ থেকে নগদ ৭৯ কোটি এবং নন-ক্যাশ ২২৯ কোটি টাকা আদায় করেছে। তবে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছেই পাওনা রয়েছে ২ হাজার ২৮৮ দশমিক ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ‘আমাদের বাড়ি লিমিটেড’-এর কাছেই বকেয়া ২০৪ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা।
বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরীর মতে, বেসিক ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কার্যত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’তে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, সুশাসন নিশ্চিত না করে কেবল নগদ সহায়তা দিয়ে এগুলোকে বাঁচানো অসম্ভব। বর্তমান চেয়ারম্যান আগামী তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, যার মাধ্যমে ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধারের আশা করা হচ্ছে।
Leave a Reply